
নাজমুল হোসাইন মাহী, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। নতুন আসন বিন্যাসের পর জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচারণায় নেমেছেন। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার থেকে শুরু করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াললিখন ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিতির ফলে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ এবং জামায়াতের সুসংগঠিত মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি—এই দুই বাস্তবতায় সাতক্ষীরার চারটি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা–কলারোয়া)
তালা ও কলারোয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রচারণা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তৎপরতা তুলনামূলক কম থাকায় বিশ্লেষকদের ধারণা, এই আসনের মূল লড়াই এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সাতক্ষীরা-২ (সদর–দেবহাটা)
সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুর রউফ এবং জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে শুরুতে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিলেও কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি–কালীগঞ্জ)
এই আসনে নির্বাচনী সমীকরণ সবচেয়ে জটিল ও বহুমাত্রিক। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন, জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম—এই তিনজনকে ঘিরেই মূল প্রতিযোগিতা গড়ে উঠছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রচারণায় প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। অপরদিকে আপিলের মাধ্যমে প্রার্থী বৈধতা পাওয়ার পর ডা. শহিদুল আলমের মাঠে সক্রিয়তা এই আসনকে ত্রিমুখী লড়াইয়ে রূপ দিয়েছে। জেলা জুড়ে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করেছে।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ড. মনিরুজ্জামান মনির এবং জামায়াতের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে শ্যামনগর অংশের প্রার্থীরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনেই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও ঐক্য ধরে রাখা যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি জামায়াতের সংগঠিত প্রচারণা প্রতিটি আসনেই ভোটের সমীকরণকে কঠিন করে তুলছে। সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার চার আসনেই ভোটের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।
আইএ/সকালবেলা